অন্থীনকাল

অন্থীনকাল

 "
অন্থীনকাল"
প্রিয় মুসলিম, জান্নাতের অনন্ত জীবন নিয়ে একটু চিন্তা করুন। সেখানে শুধু আনন্দই আছে, কোনো দঃখ নেই, অন্তহীন সুখের এক জায়গা যেখানে মুমিনরা যা-কিছু চায় তার সবই দেওয়া হবে, এমনকি তার চেয়েও বেশিই দেওয়া হবে। জান্নাত, যেখানে এমন সব সুখের উপকরণ আছে—যা কোনো চোখ কোনোদিন দেখেনি, কোনো কান কোনোদিন এর সমতুল্য কিছু শোনেনি, আর না কোনো অন্তর কখনো তা কল্পনা করেছে। এর আনন্দ আর সুখের উপকরণগুলো কোনোদিন শেষ বা নষ্ট হয়ে যাবে না, এমনকি লক্ষ কোটি বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও না। আখিরাত হচ্ছে অনন্ত জীবন, যার আগমন ঘটবে দুনিয়ার জীবনের শেষে। আখিরাতের জীবনের বিপরীতে এমন এক জীবন কতটুকুই বা গুরুত্বপূর্ণ—যার মেয়াদ খুব কমই শত বছরকে স্পর্শ করতে পারে, যার এক তৃতীয়াংশ পার হয়ে যায় শৈশবে, আর সত্তর বছরের ঊর্ধ্বে গেলেই যেখানে সময় কাটে দুর্বলতা আর অসহায়ত্বে? একজন মানুষের জীবনসীমার যতটুকু অবশিষ্ট থাকে তার অর্ধেক পার হয়ে যায় ঘুমে, এবং এর কিছু অংশ ব্যয় হয় পানাহার এবং জীবিকা অর্জনের কাজে। এর খুব সামান্য অংশই ইবাদতের কাজে ব্যবহৃত হয়। মানুষের কি উচিত হবে, অল্প সময়ের ইবাদতের বিনিময়ে অনন্তকালের জীবন ক্রয় করতে চাওয়া? যারা এই লেনদেনে খুব একটা আগ্রহী নয়, নিঃসন্দেহে তারা দুনিয়ার জীবন দ্বারা প্রতারিত, এবং আল্লাহর ওয়াদার প্রতি তাদের যে বিশ্বাস, তাতে অবশ্যই ত্রুটি রয়েছে। [সাইদুল খাতির, পৃষ্ঠা: ৪৫২]
এই দুনিয়ার জীবনের মেয়াদ বেশ সংক্ষিপ্ত এবং এর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য একেবারেই সাময়িক।  ঠিক যেমন আবূ-হাযিম সালামাহ ইবনু রাহিমাহুল্লাহ-এর বর্ণনা দিয়েছেন।তিনি বলেন—
এই জীবনের যা-কিছু চলে গিয়েছে তা ঠিক একটি স্বপ্নের মতো এবং যা কিছুই অবশিষ্ট রয়েছে, তা হলো আশা।  [সিয়ারু আলামিন নূবালা, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৯৯]
প্রিয় মুসলিম, এই মূল্যবান বক্তব্যটি খেয়াল করুন—
আমরা চারটি বিষয়ের অনুসন্ধান করতাম; কিন্তু সেগুলোকে অর্জন করতে পারিনি। কেননা, আমরা ন্যয়সঙ্গত জায়গা থেকে তাদেরকে খুঁজিনি:
(১) আমরা অর্থসম্পদের মাঝে প্রাচুর্য খুঁজেছি; কিন্তু প্রাচুর্য আছে সন্তুষ্টিতে। 
(২) আমরা বিলাসিতার মাঝে আরাম খুঁজেছি; কিন্তু বাস্তবে আরাম আছে অল্পে তুষ্ট থাকার মাঝে।
(৩) আমরা সম্মান খুঁজেছি ভালো ব্যবহারের মাঝে; কিন্তু সম্মান তো রয়েছে তাকওয়ায়।
(৪) আমরা সুখ খুঁজেছি খাবার আর পোশাকে; কিন্তু সুখ আছে বিনয় আর ইসলামে।
প্রিয় পাঠক, নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন, এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মাঝে কোনগুলো আপনি চান, আর এদের মাঝে কোনগুলো আপনার চোখ ও হৃদয় কামনা করে? আতা আল-খুরাসানী রাহিমাহুল্লাহ একবার বলেছিলেন— 
আমি তোমাদের এই দুনিয়ার জীবন রক্ষণাবেক্ষণে সময় নষ্ট করতে বলি না; কেননা, তোমরা তো দুনিয়ার জীবনের দিকে খেয়াল রেখেছই। এ জীবনের ব্যাপারে তোমরা বেশ আগ্রহী আর সতর্ক! আমি বরং তোমাদেরকে উপদেশ দিই আখিরাতের দিকে খেয়াল রাখার জন্য। এই ক্ষণস্থায়ী জীবন থেকে অনন্ত জীবনের জন্য পাথেয় নিয়ে নাও। মনে  করে নাও—তোমরা এই জীবন ছেড়ে চলে গিয়েছ এবং আল্লাহর কসম, তোমরা অবশ্যই একে ছেড়ে চলে যাবে। মনে করো, তোমরা মৃত্যুর স্বাদ পেয়ে গেছ, এবং আল্লাহর কসম, তোমরা অবশ্যই সে অবস্থায় পৌছাবে।  [সিফাতুস সাফওয়া, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৫১]
শাকীক আল-বালখী রাহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন, লোকেরা এমন তিনটি কথা বলে, যা তাদের কাজের বিপরীতে সাক্ষ্য দেয় :
(১) তারা বলে, তারা আল্লাহর গোলাম; কিন্তু কাজ করে স্বাধীন মানুষের মতো। এটি তাদের বক্তব্যের স্ববিরোধিতা। 

(২) তারা বলে, আল্লাহ রিযক সরবরাহ করেন, অথচ তাদের হৃদয় এই দুনিয়ার জীবনের ধন-দৌলত আর চাকচিক্য অর্জন করা ব্যতীত কিছুতেই সন্তুষ্ট হয় না; এখানেও স্ববিরোধিতা প্রতীয়মান।

(৩) তারা বলে, মৃত্যু থেকে পালাবার কোনো উপায় নেই; কিন্তু তারা এমনভাবে কাজ করে যেন কখনোই তাদের মৃত্যু হবে না। এটিও তাদের বক্তব্যের স্ববিরোধিতা হিসেবে প্রকাশ পায়। 
 [মুকাশাফাতুল-কুলূব, পৃষ্ঠা: ৩৫]
ইবরাহীম আল-তাইমী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন— 
মনে মনে আমি নিজেকে জান্নাতের ফল ও পানীয় পান করতে থাকা অবস্থায় এবং সেখানে কুমারী নারীদেরকে আলিঙ্গন করতে থাকা এবং জাহান্নামের করলাম। আবার জাহান্নামের যাক্কুম পুঁজ পান করতে থাকা এবং জাহান্নামের শিকল ও হাতকড়া পরা অবস্থায় কল্পনা করলাম। সুতরাং আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম,তুমি কী চাও? সে আমাকে বলল, আমি দুনিয়ার জীবনে ফেরত যেতে চাই, যাতে করে আমি নেক আমল করতে পারি। আমি বললাম, তুমি যেখানে যেতে চাও এখনোও সেখানেই আছ, সুতরাং কাজ করো। [সিফাতুস সাফওয়া, খণ্ড : ২; পৃষ্ঠা: ৫১৭]
_______________________________
শাইখ আব্দুল মালিক আল-কাসিম


Comments

Popular posts from this blog

কেয়ামতের আলামত, মানুষ লাঠি ও জুতার ফিতার সাথে কথা বলবে

কিয়ামতের আলামত ও বর্তমান বিশ্বের কিছু আলামত

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস