তাওবা-ইস্তিগফার কিভাবে করতে হবে? এবং ইস্তেগফার এর দু'আ সমূহ

  

তাওবা-ইস্তিগফার কিভাবে করতে হবে? এবং ইস্তেগফার এর দু'আ সমূহ


তাওবা-ইস্তিগফার কিভাবে করতে হবে? এবং ইস্তেগফার এর দু'আ সমূহ 

***********************************************

 ইস্তিগফারঃ

ইস্তিগফার শব্দের অর্থ, ক্ষমা চাওয়া। আর শরিয়তের পরিভাষায় এর অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ তা'আলার কাছে নিজের পাপ ও গুনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং গুনারাশি মাফ পাওয়ার জন্য ক্ষমা চাওয়া।  

ইস্তিগফারের ফযীলত এবং ইস্তিগফার সম্পর্কে মহান আল্লাহর নির্দেশঃ

ইস্তিগফার সম্বন্ধে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ ঈরেনঃ

-------"তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল।"

-----(সুরা-৭১ নূহ, আয়াত: ১০)

-------"অতঃপর তোমার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।"

-----(সুরা-১১০ নাসর, আয়াত: ৩)

-------"আর আল্লাহ তা'আলা আজাব দেবেন না তাদের, আপনি তাদের মাঝে থাকা অবস্থায়; আর আল্লাহ তাদের আজাব দেবেন না, যখন তারা ইস্তিগফার করে।"

-----(সুরা-৮ আনফাল, আয়াত: ৩৩)

তাওবাঃ

তাওবা শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো, ফিরে আসা। অর্থাৎ- মানুষ যখন ভুল পথে বা পাপের পথে বা কোন গুনাহের পথে যায় বা বিপথগামী হয়, তখন সেখান থেকে সঠিক পথে বা ভালো পথে বা মহান আল্লাহর পথে ফিরে আসাকে তাওবা বলা হয়। আর তাওবার পারিভাষিক অর্থ হলো, লজ্জিত হওয়া। অর্থাৎ-স্বীয় কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হয়ে সঠিক পথে ফিরে আসা! 

তাওবার জন্য করণীয় হলো, স্বীয় কৃতকর্মের প্রতি লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া, সেই অপরাধ আর না করার দৃঢ় প্রত্যয় ও সংকল্প গ্রহণ করা এবং তা থেকে নিজেকে দূরে রাখা বা বিরত রাখা এবং নেক আমলের প্রতি অতি বেশিমাত্রায় মনোযোগী হওয়া।

 ️তাওবা সম্পর্কে পবিত্র আল-কুরআনে মহান আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ ফরমানঃ

 -------"হে ইমানদারেরা! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো, আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে ঝরনাসমূহ প্রবহমান।"

-----(সুরা-৬৬ তাহরিম, আয়াত: ৮)

-------"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তওবাকারীদের ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।"

-----(সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২২২)

 সুতরাং তাওবা-ইস্তিগফার শব্দ দু’টির অর্থ প্রায়ই কাছাকাছি! এর একটি বিষয় হচ্ছে, কৃত সকল পাপ 

বা গুনাহের কাজের জন্য মহান আল্লাহ পাক এর কাছে লজ্জিত হওয়া এবং তার থেকে ফিরে আসা এবং ঐ পাপ থেকে দূরে থাকা এবং তার থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আর অন্যটি হচ্ছে, নিজের কৃত পাপ বা গুনাহ মাফের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দু'আ করা।

রাসুলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

-------"হে মানব সকল! তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে আসো, নিশ্চয় আমি প্রতিদিন ১০০ বার তওবা করি।"

-----(মুসলিম)

 তাওবা-ইস্তিগফার কিভাবে করতে হবে?

তাওবা-ইস্তিগফার করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি এবং দু'আ পবিত্র হাদীসের মধ্যে বর্ণনা করা হয়েছে! আমরা এখানে সহজ কিছু বর্ণনা তুলে ধরলাম।

সালাতের মাধ্যমে তাওবা-ইস্তিগফার করাঃ

তাওবার নিয়তে দু'রাকাত নফল সালাত আদায় করা। এই সালাত দিন ও রাতের যে কোন সময়ে আদায় করা যায়। অন্যান্য নামাজের মতো দু' রাকা'আত নফল সালাত। প্রতি রাকা'আতে সূরা ফাতিহার পরে যে কোন সূরা পাঠ করা যায়। তবে অধিকাংশ আলেম গণের মতে সূরা ফাতিহার পরে ৩/৫/৭/১০/১১/১৫/২০/২৫/৪০/৫০/১০০/২০০ করে বা যতটা সম্ভব পড়া যায় ততবার করে সূরা ইখলাস পাঠ করা উত্তম। নামাজ শেষে দরূদ শরীফ এবং তাওবা-ইস্তিগফার এর বিভিন্ন দু'আ পাঠ করে বিনীত ভাবে মহান আল্লাহ তা'আলার কাছে গুনাহ মাফের জন্য প্রার্থনা করতে হবে। সাধারণতঃ রাতের বেলা এই সালাত আদায় করা উত্তম।।

 তাওবা-ইস্তিগফার করার বা ক্ষমা চাওয়ার জন্য উল্লেখযোগ্য নাঁচটি দু'আঃ

দু'আ নং-০১]

সবচেয়ে ছোট দু'আঃ

 أَستَغْفِرُ اللهَ

উচ্চারণঃ আস্তাগফিরুল্লা-হ।

অনুবাদঃ আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

প্রতি ওয়াক্তের ফরয সালাতে সালাম ফিরানোর পর রাসুলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম এই দু'আ তিনবার পড়তেন। 

-----[মিশকাত-৯৬১]

এছাড়াও সারাক্ষণ(টয়লেট বাথরুম ছাড়া)এই ইস্তিগফার টি পড়ে জিহবা ভিজিয়ে রাখুন। কেননা, এর ফযীলত অনেক বেশি।

 দু'আ নং-০২]

মূল আরবীঃ أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ 

উচ্চারণঃ আস্তাগফিরুল্লা-হা ওয়া আতূবু ইলাইহি।

অনুবাদঃ আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর দিকেই ফিরে আসছি।

 রাসুল সাল্লল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন ৭০ বারের অধিক তাওবা ও ইসতিগফার করতেন। 

-----[বুখারী-৬৩০৭]

 দু'আ নং-০৩]

মূল আরবীঃ  أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণঃ আস্‌তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা- ইলা-হা ইল্লা- হুওয়াল হাইয়্যুল কইয়্যূম ওয়া আতূবু ইলায়হি।

অনুবাদঃ আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, তিনি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন মা‘বূদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী এবং তাঁর কাছে তাওবাহ্ করি।

এই দু'আ পড়লে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন-যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারী হয়। 

-----[আবু দাউদ-১৫১৭, তিরমিযী-৩৫৭৭, মিশকাত-২৩৫৩]

দু'আ নং-০৪]

মূল আরবীঃ رَبِّ اغْفِرْ لِيْ وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ (أنْتَ) التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ / الغَفُوْرُ

উচ্চারণঃ রাব্বিগ্ ফিরলী, ওয়া তুব ‘আলাইয়্যা, ইন্নাকা আনতাত তাওয়া-বুর রাহীম। দ্বিতীয় বর্ণনায়- “রাহীম”-এর বদলে: ‘গাফূর’।

অনুবাদঃ হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহান তাওবা কবুলকারী করুণাময়। দ্বিতীয় বর্ণনায়: তাওবা কবুলকারী ও ক্ষমাকারী।

রাসুলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে বসে এক বৈঠকেই এই দু'আ ১০০ বার পড়েছেন।

 -----[আবূ দাঊদ-১৫১৬, ইবনু মাজাহ-৩৮১৪, তিরমিযী-৩৪৩৪, মিশকাত-২৩৫৩]

দু'আ নং-০৫ [ 

সাইয়েদুল ইস্তিগফার-বা আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ দুআ!! সায়্যিদুল ইস্তেগফার সর্বশ্রেষ্ট ইস্তিগফার এবং এটি সকাল সন্ধ্যার জিকির।

মূল আরবীঃ اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আনতা রব্বী লা-ইলাহা ইল্লা আনতা খালাক্কতানী ওয়া আনা আ'বদুকা ওয়া আনা আ'লা আহ্দিকা ওয়া ও’য়াদিকা মাসতাত’তু আ'উযুবিকা মিন শার্রি মা ছা’নাতু আবূউলাকা বিনি'মাতিকা আ'লাইয়্যা ওয়া আবূউলাকা বিযানবী ফাগ্ফির্লী ফাইন্নাহু লা-ইয়াগফিরুয্যুনূবা ইল্লা আনতা।

অনুবাদঃ হে আল্লাহ! আপনিই আমার প্রতিপালক। আপনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আপনিই আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি আপনারই গোলাম। আমি যথাসাধ্য আপনার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের উপর আছি। আমি আমার সব কৃতকর্মের কুফল থেকে আপনার কাছে পানাহ চাচ্ছি। আপনি আমার প্রতি আপনার যে নিয়ামত দিয়েছেন তা স্বীকার করছি। আর আমার কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। আপনি আমাকে মাফ করে দিন। কারণ, আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারবে না।

 এই দু'আ সকালে পড়ে রাতের আগে মারা গেলে অথবা রাতে পড়ে সকালের আগে মারা গেলে সে নিশ্চিত ভাবেই জান্নাতে যাবে। 

-----[বুখারী-৬৩০৬]

এই দু'আগুলো পড়ার মাধ্যমে আমরা তাওবা-ইস্তেগফার করার চেষ্টা করবো ইন শা আল্লাহ! তবে 

সব চেয়ে উত্তম হলো সায়্যিদুল ইস্তেগফার।

বিঃদ্রঃ

আরবি উচ্চারণ বাংলায় সঠিকভাবে হয় না। তাই নিজে আরবি না জানলে উত্তমরূপে আরবি পড়তে জানে এমন কারো নিকট থেকে দু'আগুলোর উচ্চারণ শিখে নেওয়া আবশ্যক।।

 বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে,

তাওবা-ইস্তিগফার যে কোন শব্দেই করা যায়। এমনকি ❝ইয়া আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দিন!❞ - বলে দু'আ করলেও তা তাওবা-ইস্তিগফার হিসেবে গণ্য হবে। তবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে বাক্যে ইস্তিগফার করেছেন, সে বাক্যে ক্ষমা চাওয়া নিঃসন্দেহে অতি উত্তম! যা আমরা উপরে উপস্থাপন করেছি! আশা করি সকলেই শুদ্ধ ভাবে মুখস্থ করে নিতে পারেন ইন শা আল্লাহ্।

Comments

Popular posts from this blog

কেয়ামতের আলামত, মানুষ লাঠি ও জুতার ফিতার সাথে কথা বলবে

কিয়ামতের আলামত ও বর্তমান বিশ্বের কিছু আলামত

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস